হাদিসের আলোকে নারী ও পুরুষের খতনা | একটি সংক্ষিপ্ত ও সঠিক আলোচনা

নারীদের খতনার (যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় FGM বা Female Genital Mutilation বলা হয়) ইতিহাস অনেক পুরনো। এটি কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্ম বা গোষ্ঠী থেকে শুরু হয়নি, বরং ভৌগোলিক এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে এর উৎপত্তি হয়েছে।

আমি এই বিষয়টি নিয়ে কেন এখানে পোস্ট করছি? কেন বা এমন একটি বিষয় নিয়ে লিখতে হবে? 

  • কিছু উগ্রপন্থী ইসলাম বিদ্বেষী আছেন, যারা দাবি করেন এটি ইসলামের একটি প্রথা। 
  • এছাড়া নাস্তিকেরা এসব বিষয় উপস্থাপন করে ইসলাম ধর্মকে অপমান করার চেষ্টা করে।
  • সচেতনতা তৈরি ও সামাজিক দায়বদ্ধতা

এর সূত্রপাত ও বিস্তার সম্পর্কে প্রধান ঐতিহাসিক ধারণাগুলো নিচে দেওয়া হলো:

১. প্রাচীন মিশর (সবচেয়ে শক্তিশালী উৎস)

ইতিহাসবিদদের মতে, এই প্রথার সবচেয়ে পুরনো প্রমাণ পাওয়া যায় প্রাচীন মিশরে (খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দী বা তারও আগে)। নীল নদ অববাহিকার এই সভ্যতায় এটি প্রচলিত ছিল।

অনেক গবেষক মনে করেন, এটি প্রাচীন মিশরের দাসপ্রথার সাথে যুক্ত ছিল অথবা উচ্চবংশীয় নারীদের পবিত্রতা প্রমাণের একটি মাধ্যম হিসেবে শুরু হয়েছিল।

 গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস (Herodotus) খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দীতে উল্লেখ করেছিলেন যে, মিশরীয়রা তাদের নারীদের খতনা করত। একে অনেক সময় 'ফেরাউনি খতনা'ও বলা হয়।

২. লোহিত সাগর ও আফ্রিকা অঞ্চল

মিশর থেকে এই প্রথাটি ধীরে ধীরে লোহিত সাগরের তীরবর্তী এলাকা এবং সাব-সাহারা আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ইথিওপিয়া, সুদান এবং সোমালিয়ার মতো দেশগুলোতে এটি প্রাক-ইসলামি এবং প্রাক-খ্রিস্টীয় যুগ থেকেই একটি শক্তিশালী সামাজিক রীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। সেসব সমাজে এটি ছিল মেয়েদের 'প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা' বা বিয়েযোগ্য হওয়ার একটি পূর্বশর্ত।

৩. প্রাচীন আরব উপদ্বীপ

ইসলামের আবির্ভাবের অনেক আগে থেকেই আরবের কিছু গোত্রে এই প্রথাটি প্রচলিত ছিল। আরবরা মূলত তাদের প্রতিবেশী মিশরীয় এবং আবিসিনিয়ার (বর্তমান ইথিওপিয়া) সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এটি গ্রহণ করেছিল। সেই সময়ে আরবে এটিকে বলা হতো 'খিফায' (Khifadh)। এটি কোনো ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা হিসেবে নয়, বরং একটি প্রচলিত বংশীয় রীতি হিসেবে পালিত হতো।

৪. প্রথাটি কেন চালু হয়েছিল? (তৎকালীন বিশ্বাস)

প্রাচীন সভ্যতাগুলোতে এটি চালু হওয়ার পেছনে মূলত তিনটি কারণ কাজ করত:

পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্য: সেই যুগের মানুষের ধারণা ছিল এটি শরীরকে পরিচ্ছন্ন রাখে (যদিও আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এর উল্টোটা বলে)।

যৌন নিয়ন্ত্রণ: প্রাচীন পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর যৌন আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ করা এবং বিয়ের আগে কুমারিত্ব বজায় রাখার একটি নিষ্ঠুর মাধ্যম হিসেবে এটি ব্যবহৃত হতো।

 সামাজিক মর্যাদা: অনেক গোত্রে বিশ্বাস করা হতো যে, খতনা না করা মেয়েদের রান্না করা খাবার অপবিত্র বা তারা সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের অযোগ্য।

৫. ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মের অবস্থান

একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে এটি কেবল একটি ইসলামি প্রথা। আসলে এটি একটি সাংস্কৃতিক প্রথা, ধর্মীয় নয়।

এটি ইসলাম আসার কয়েক হাজার বছর আগে থেকে বিদ্যমান ছিল।

  • বর্তমানেও আফ্রিকার অনেক খ্রিস্টান এবং কিছু ইহুদি গোত্রের (যেমন ইথিওপিয়ার ফালাশা ইহুদি) মধ্যে এই প্রথা দেখা যায়।
  • ইসলাম এই প্রথাটি চালু করেনি, বরং আরবে আগে থেকে বিদ্যমান এই প্রথাটিকে নিরুৎসাহিত করেছে এবং অত্যন্ত সীমিত (ক্ষতিহীন) পর্যায়ে রাখার নির্দেশ দিয়েছে, যা পরবর্তীতে অধিকাংশ মুসলিম দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।



ইসলাম পূর্ববর্তী যুগে আরবে যে প্রথাগুলো আগে থেকেই প্রচলিত ছিল, ইসলাম এসে সেগুলোর সব কিছু একবারে নিষিদ্ধ করেনি। বরং সেগুলোকে ৩টি ভাগে বিন্যস্ত করেছিল:

১.যা পুরোপুরি ভালো ও মানবিক: সেগুলোকে ইসলাম বহাল রাখে (যেমন: মেহমানদারী, চুক্তির মর্যাদা)।

২.যা চরম ক্ষতিকর ও অন্যায়: সেগুলোকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে (যেমন: কন্যাসন্তান জীবন্ত দাফন, মদ্যপান, সুদ)।

৩.যা সমাজে গভীরভাবে গেড়ে বসেছিল কিন্তু তাতে কুসংস্কার বা অতিরঞ্জন ছিল: সেগুলোকে ইসলাম  সংস্কার (Reform) ও নিয়ন্ত্রণ করে। নারীদের খতনার বিষয়টি এই ৩ নম্বর ক্যাটাগরিতে পড়ে।


ইসলাম ধর্মে এটি যেভাবে প্রবেশ বা পরিমার্জিত হলো, তার ধারাবাহিক প্রেক্ষাপট নিচে দেওয়া হলো:

১. আরবের বিদ্যমান সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা (Continuity)

নবী মুহাম্মদ ﷺ যখন মক্কায় ও পরবর্তীতে মদিনায় ইসলাম প্রচার শুরু করেন, তখন তিনি দেখতে পান যে আরবের সমাজব্যবস্থায় নারী ও পুরুষ উভয়ের খতনার প্রচলন আগে থেকেই ছিল। আরবরা এটিকে তাদের সামাজিক ঐতিহ্য মনে করত। ইসলাম একে নতুন করে শুরু করেনি, বরং সমাজে আগে থেকে চালু থাকা একটি প্রথা হিসেবেই এটি ইসলামি যুগে প্রবেশ করে।

২. হাদিসের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ ও সংস্কার

তৎকালীন আরবে নারীদের খতনার ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম ছিল না, যার ফলে অনেক সময় অতিরঞ্জন বা শারীরিক ক্ষতির শিকার হতে হতো মেয়েদের। রাসুল ﷺ মদিনায় গিয়ে যখন এটি লক্ষ্য করলেন, তখন তিনি এটি পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করে এর ক্ষতিকর দিকটি দূর করার জন্য সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেন।

সুনান আবু দাউদের (হাদিস নং ৫২৭১) বর্ণনা অনুযায়ী, মদিনায় উম্মে আতিয়াহ (রা.) নামের একজন নারী ছিলেন যিনি এই কাজ করতেন। রাসুল ﷺ তাকে ডেকে এর একটি নিরাপদ সীমা নির্ধারণ করে দিয়ে বলেন:

> "সামান্য অংশ কাটবে, বেশি কাটবে না। কারণ এটি নারীর চেহারাকে উজ্জ্বল করে এবং স্বামীর জন্য আনন্দদায়ক হয়।"


ইসলামের মূল উদ্দেশ্য ছিল: তৎকালীন আরবের প্রচলিত একটি সংস্কৃতিকে এমন একটি ফ্রেমে বেঁধে দেওয়া যেন কোনো নারীর শারীরিক বা অঙ্গহানি (Mutilation) না ঘটে।

৩. ফিকহী পরিভাষায় রূপান্তর

রাসুল ﷺ-এর এই নির্দেশনার পর ইসলামি আইনবিদ বা ইমামগণ (যেমন: ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আবু হানিফা) এটিকে ফিকহের কিতাবগুলোতে অন্তর্ভুক্ত করেন।

  •  তাঁরা পুরুষের খতনাকে 'খিতান' এবং নারীর খতনাকে  'খিফায' হিসেবে নামকরণ করেন।
  •  যেহেতু রাসুল ﷺ এটি সরাসরি নিষিদ্ধ করেননি, তাই হানাফী মাজহাবের ইমামগণ একে 'মাকরামা' বা একটি 'ঐচ্ছিক সম্মানজনক প্রথা' হিসেবে স্বীকৃতি দেন। অর্থাৎ, কেউ যদি তার সংস্কৃতির অংশ হিসেবে এটি করতে চায়, তবে সে হাদিসের নিয়ম মেনে করতে পারে, কিন্তু এটি ধর্মের কোনো বাধ্যতামূলক অঙ্গ বা ইবাদত নয়।

৪. আধুনিক যুগে ইসলামের অবস্থান পরিবর্তন কেন?

ইসলামের একটি মৌলিক নীতিমালা হলো—"লা দারারা ওয়া লা দিরার" (কারো ক্ষতি করা যাবে না এবং নিজেরও ক্ষতি সহ্য করা যাবে না)।

প্রাচীন যুগের সেই সূক্ষ্ম বা সীমিত প্রথাটি কালক্রমে আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে চরম ও অনৈসলামিক 'অঙ্গহানি' বা FGM (Female Genital Mutilation)-এর রূপ নেয়, যা নারীর মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মনস্তাত্ত্বিক কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

যেহেতু চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রমাণিত হয়েছে যে নারীদের ক্ষেত্রে এর কোনো স্বাস্থ্যগত উপকারিতা নেই (যা পুরুষদের ক্ষেত্রে আছে), তাই আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়সহ বর্তমান বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ইসলামি স্কলার ও ফতোয়া বোর্ডগুলো এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে: "ইসলামের নামে নারীদের এই খতনা বা অঙ্গহানির প্রথাটি বর্তমান যুগে পুরোপুরি বর্জনীয়।"

সারসংক্ষেপ: ইসলাম এই প্রথাটি প্রবর্তন করেনি। এটি আগে থেকেই আরবে চালু ছিল। ইসলাম একে শুধুমাত্র একটি ক্ষতিকর প্রথা থেকে সুরক্ষার জন্য নীতিগত সংস্কার করেছিল, যা কালক্রমে বর্তমান যুগে এসে প্রায় পুরোপুরি বিলুপ্তির পথে।




Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন